Home সিলেট সিলেটের শিক্ষা প্রশাসন: নিয়ন্ত্রণে শিক্ষামন্ত্রীর ‘তিন খলিফা’

সিলেটের শিক্ষা প্রশাসন: নিয়ন্ত্রণে শিক্ষামন্ত্রীর ‘তিন খলিফা’

0
শেয়ার করুনঃ

সিলেটের শিক্ষা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের তিন খলিফা। এরা হলেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একেএম গোলাম কিবরিয়া তাপাদার, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম শোয়েব ও যুবলীগ নেতা অ্যাডভোকেট আব্বাস উদ্দিন। এদের নেতৃত্বেই স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনে চলছে নিয়োগ, বদলি, ভর্তি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও বাণিজ্য। বিভাগীয় শহরে থাকা তিনটি সরকারি দফতর এ তিনজনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নির্বাচনী এলাকা সিলেট-৬ আসনের বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় রয়েছেন মন্ত্রীর আরও দু’জন প্রতিনিধি। এর মধ্যে বিয়ানীবাজারে আছেন শিক্ষামন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে দেওয়ান মাকসুদুল ইসলাম আউয়াল। আর গোলাপগঞ্জে আছেন, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন। শিক্ষামন্ত্রীর আস্থাভাজন হিসেবে এ দু’জন স্থানীয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।

জানা যায়, শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর আস্থাভাজন একেএম গোলাম কিবরিয়া তাপাদারকে প্রেষণে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে সচিব পদে নিয়োগ দেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। সচিবের দায়িত্বে থাকাকালে তিনি একাধিকবার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। গত নভেম্বরে তিনি ভারমুক্ত হয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। অভিযোগ রয়েছে, একটি পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণী থাকার পরও রাষ্ট্রপতির বিশেষ কোটায় একাধিক প্রমোশন পেয়ে তিনি প্রফেসর পদে উন্নীত হন। তবে এ অভিযোগটি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন গোলাম কিবরিয়া তাপাদার। তিনি জানান, চাকরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই তিনি প্রফেসর হয়েছেন।

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যথাযথ পর্যবেক্ষণের অভাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, পরীক্ষা কেন্দ্র প্রদানে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে। বোর্ডের অধীনে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইচ্ছেমতো বেতন ও এসএসসি পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি নেয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায় তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হয়।’ শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন অনিয়ন-দুর্নীতির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সচিব থেকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে শতভাগ সততার সঙ্গে কাজ করেছি। বোর্ডের চেয়ারম্যানের চেয়ে আমার কাছে কলেজের শিক্ষকতাই স্বাচ্ছন্দ্যের মনে হয়। বিষয়টি একাধিকবার শিক্ষামন্ত্রীকে জানিয়েছি। শিক্ষামন্ত্রীর কাছ থেকে কোনো অবৈধ সুযোগ-সুবিধাও নেইনি।’

এদিকে নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর অনেকটা প্রভাব খাটিয়ে একাডেমিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে সিলেটে কৃষি বিদ্যালয়ের (সিকৃবি) রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়া বদরুল ইসলাম শোয়েবকে। কারণ তিনি মন্ত্রীর আস্থাভাজন। নিয়োগ পেয়েই বদরুল ইসলাম শোয়েব বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে নিয়ে নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই ‘এডহক’ ভিত্তিতে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, সিকৃবির টেন্ডার ইভালুয়েশন কমিটির প্রধান প্রফেসর ডা. রফিকুল ইসলাম, সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার কামাল হোসেন মোল্লাকে জোরপূর্বক কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগে বাধ্য করান রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম শোয়েব। পরে উপাচার্য, রেজিস্ট্রার এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার একেএম ফজলুর রহমানের অনুগত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের দিয়ে কমিটি গঠন করে ২০০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যাদেশ প্রদান করেন। এমএস না থাকা সত্ত্বেও উপাচার্যের মেয়েকে পদোন্নতি দিতে শিক্ষক পদোন্নতি নীতিমালা সংশোধন করে শুধু কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে শিক্ষকরা এমএস ছাড়া সহকারী অধ্যাপক হতে পারবেন এমন নিয়ম চালু করেন রেজিস্ট্রার।

এছাড়া গত মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ জন ড্রাইভার নিয়োগ দেয়া হয়। এরমধ্যে রেজিস্ট্রার শোয়েবের সুপারিশে ২ জন, উপাচার্যের সুপারিশে ২ জন এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রারের সুপারিশে ১ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে বদরুল ইসলাম শোয়েবের নেতৃত্বে ১০ জন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পান। যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন না করে একক সিদ্ধান্তে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের স্বজনপ্রীতি এবং বিপুল অংকের টাকা ঘুষ নিয়ে এসব নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩০ কর্মকর্তা থাকার পরও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে কেন জরুরি ভিত্তিতে আরও ১০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হল এ নিয়ে অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। নিয়োগ প্রাপ্তদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ৪ জন, বাকিরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা। নিয়োগ পাওয়া চারজনের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সুপারিশ করেন। এছাড়া দু’জন উপাচার্যের নিকটাত্মীয়, রেজিস্ট্রারের সুপারিশে ১ জন, ডেপুটি রেজিস্ট্রারের সুপারিশে ১ জন, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সুপারিশে ১ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে তাহমিনা আক্তার চৌধুরী টুলটিকর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মাযহার চৌধুরীর মেয়ে। অন্যজন আফরিন মনির পরিবার বিএনপির রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, বদরুল ইসলাম শোয়েব শিক্ষামন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে উপাচার্যদের বশে আনেন। পরে নানা প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায় করেন। তারা জানান, বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে শোয়েবের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে ৩০ জনকে নিয়োগের একটি প্যানেল তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ১০ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। বাকিদের দু-একজন করে গোপনে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। উপাচার্য ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে রেজিস্ট্রারের পরামর্শে উচ্চ মাধ্যমিক পাস হওয়া সত্ত্বেও সহকারী নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বদরুল ইসলাম শোয়েবের ঘনিষ্ঠ মফিজুল ইসলাম। তিনি একজন পেনশনভোগী কর্মকর্তা। এ ধরনের ব্যক্তিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পুনরায় নিয়োগের বিধান নেই বলেও জানান ওই শিক্ষকরা। রেজিস্ট্রারের কৃপায় বয়স ৪০-এর বেশি হওয়া সত্ত্বেও ২ বছর আগে মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ডা. রায়হানা। তাকে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এসব দুর্নীতি নিয়ে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা উপর মহলে একটি প্রতিবেদনও পাঠিয়েছে।

এতসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম শোয়েব যুগান্তরকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ একেবারেই সত্য নয়। এগুলো অপপ্রচার। যথাযথ নীতিমালা মেনেই রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছি। আর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোনো লোক নিয়োগ দেয়া হয়নি। অনুমোদন নিয়ে এবং নীতিমালা মেনেই কিছু লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাণিজ্য হয়নি।’

অপরদিকে শিক্ষামন্ত্রীর আরেক আস্থাভাজন যুবলীগ নেতা অ্যাডভোকেট আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর (সিলেট অঞ্চল) নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ। সিলেট নগরীর তিনটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে থাকা আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের সিলেটের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আর তাকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর সিলেট সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা। এছাড়া আব্বাসের বিরুদ্ধে রয়েছে এ দুটি সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অ্যাডভোকেট আব্বাস উদ্দিন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষা প্রশাসনে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নিয়োগ, বদলি ও ভর্তি সংশ্লিষ্ট দফতরের বিধি মোতাবেক হয়ে থাকে।’

এদিকে বিয়ানীবাজার উপজেলার শিক্ষা অফিসসহ স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব কাটানোর অভিযোগ রয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর এপিএস দেওয়ান মাকসুদুল ইসলাম আউয়ালের বিরুদ্ধে। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকারি কোনো অফিসে শিক্ষামন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে প্রভাব খাটাইনি।’ গোলাপগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসসহ অন্যান্য সরকারি দফতরে শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগের ব্যাপারে সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার। সরকারি কোনো দফতরে প্রভাব খাটানোর প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না।’
211 0 0 0 0

শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

Load More In সিলেট