Home জাতীয় স্বামী কাছে নিলেও সমাজ নেয়নি বীরাঙ্গনা রাজিয়াকে

স্বামী কাছে নিলেও সমাজ নেয়নি বীরাঙ্গনা রাজিয়াকে

0
শেয়ার করুনঃ


ঢাকা, ০৭ ডিসেম্বর- হানাদারদের থেকে প্রাণ বাঁচাতে যে গ্রামের বাড়িতে ছুটে গিয়ে লুট হয়েছিল সম্ভ্রম, স্বাধীনতার পর সেই গ্রামেই আর ঠাঁই হল না একাত্তরের বীরাঙ্গনা রাজিয়া বেগমের।

তবে ওই ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়ে তাকে আপন করে নিয়েছিলেন স্বামী। দুজনে মিলে আবার গড়েন সংসার। কিন্তু কুমিল্লার নবীনগরে বাবার ওই গ্রামে দ্বিতীয়বার যাওয়া হয়নি তার।

অনলাইন পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজিয়া বলেন, আমি তো আর দ্যাশেই যাই না। দ্যাশে গেলেই মানুষ খারাপ কথা কয়। কয়, মিলিটারির লগে খারাপ কাজ করছে। অনেকেই অনেক কথা কয়। ওইগুলা হুনলে তো বাঁচতে মন চায় না।

মাইনষে তো আমারে দোষ দেয়। খারাপ কয়। আমার কী দোষ আছিল?

ষাটোর্ধ্ব রাজিয়া তখন সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ। তিন মাসের একটি ছেলে ছিল তার। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকার তেজগাঁওয়ের বাসা ছেড়ে স্বামীকে নিয়ে নবীনগরে বাবার বাড়িতে উঠেছিলেন তিনি।

একাত্তরের ওই নিষ্ঠুরতার কথা তুলে ধরে রাজিয়া বলেন, একদিন আমার আম্মা ঘরে পাক (রান্না) করছিল। আর আব্বা উঠানে মাটি কাটতাছিল। আমার স্বামীও আব্বার লগে আছিল। ওই সময় আমি দোকানে যাইতে লইছি আর একটা লোক আমারে কয়, তোদের ঘরে পাঞ্জাবি উঠছে।

আমি এটা শুনে দৌঁড়ায় গিয়া দেখি, হাছাই। আমার আব্বা আর স্বামীরে পাঞ্জাবিরা জিগাইতাছে- এ্যাই মুক্তিবাহিনী কই?

মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান না দেওয়ায় বাবাকে লাথি দিয়ে মেরে ফেলে তার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানিরা।

এরপর নির্যাতিত হন রাজিয়াও, তাতে সহযোগিতা করেন স্থানীয় একজন রাজাকার।

আমার স্বামীকে একদিক দিয়া নিয়ে যায়, আর আমারে দুইটা মিলিটারি আর একটা রাজাকার ঘরের মধ্যে নিয়া যায়। আমি এতো কান্নাকাটি করে ওদের বললাম- আমার তিন মাসের বাচ্চা আছে, আমারে ছেড়ে দেন। ওরা শুনে নাই।

আমার বাচ্চাটারে ছুড়ে ফেলে দেয়। আমারে ধাক্কা দিয়া ফালায় দিয়া আমার ওপর নির্যাতন করে। রক্তে সারা ঘর ভাইসা গেছিল। আমার বাচ্চাটা তখন তিন মাসের, নাড়িও কাঁচা ছিল। আমারে কী করছে আমি বলতে পারব না। আমি অজ্ঞান হইয়া গেছিলাম।

পাকিস্তানি বাহিনী চলে যাওয়ার পর মা-বোনের সেবায় কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন রাজিয়া। এর কয়দিন পর কাউকে না জানিয়েই তিনি তিন মাসের সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন, চিকিৎসা নেন এক হাসপাতালে।

ডাক্তার দেখছে আমার পেটে কি ওগো (পাকিস্তানি) সন্তান গেছে কি না, কিছু পায় নাই। তারপর আমারে নারায়ণগঞ্জের ক্যাম্পে নিয়ে গেছিল। ওইখানে চিকিৎসা করছে। আমি মাথা ঘুরায় খালি পড়ে যেতাম, কোনো শক্তি ছিল না।

এখানেই থেমে থাকেনি রাজিয়ার যন্ত্রণা যাত্রা, কয়েকদিন পরই মারা যায় তিন মাসের ওই সন্তানটি।

আমারও খাওন নাই, বাচ্চাটারও নাই। জন্ডিস হয়া গেছিল। পরে মারা গেছে।

যুদ্ধকালে জীবনের সবচেয়ে দুঃস্মৃতির মুখোমুখি হলেও তার সেই ক্ষতে প্রলেপ দেয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। কয়েকদিন পরেই বাংলাদেশ, বাংলাদেশ স্লোগান শুনে আনন্দে মনটা ভরে ওঠে বলে জানান তিনি।

রেডিওতে কইতাছে আর মানুষ নাচতাছে।

এরপর পরিবার ছেড়ে ক্যাম্পে চলে আসা রাজিয়া আবার সংসারে ফিরে যান স্বামীর ভালোবাসায়।

তিনি বলেন, আমি তার কাছে আর যেতে চাই নাই। দেশ স্বাধীন হওনের পর আমার স্বামী ঢাকায় আইসা আমারে অনেক খুঁজছে। শাহবাগে আসার পর ক্যাডা বলে কইছে- নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পে অনেকগুলা মাইয়ারে নিয়া গেছে। এইটা শুইনা আমার স্বামী ওইহানে গেছে।

ওইখানে মানুষ আসছে শুইনা আমি গেছি, অনেক মাইয়া গেছে। গিয়া আমার স্বামীকে দেখছি। উনি আমারে দেখে ডাকছে। আমি শরমে আর তাকাই না। পরে আমার হাত ধরে টান দিয়া নিয়া কয়, আমি বাড়ি থেইকা সব শুইনা আইছি, লজ্জার কিছু নাই। বাদ দে এসব। এইটা তো একটা এ্যাক্সিডেন্ট, এটুকু বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন আবেগাপ্লুত রাজিয়া।

নির্যাতিত হওয়ায় গ্রামের মানুষের বাজে আচরণ পেলেও তাকে আগলে রাখেন স্বামীই। পরে সংসারে আসে আরও চার সন্তান। বছর দশেক আগে মারা যায় তার স্বামী। এরপর সন্তানদের সাথে থাকেন তিনি।

পোলাপাইনের অভাবের সংসারে থাকতাছি কোনোমতে। আমাদের জন্য যদি সরকার কিছু করত, তাহলে অনেক উপকার হত।

সূত্র: বিডিনিউজ২৪

আর/১২:১৪/০৭ ডিসেম্বর

শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

Load More In জাতীয়