• বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪১ অপরাহ্ন

মেঘে ঢাকা আকাশ, টানা বৃষ্টিতে বানিয়াচংয়ে চরম ভোগান্তি

স্টাফ রিপোর্টার / ৪৪ Time View
Update : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

গত কয়েকদিন ধরে বিরতিহীন টানা বর্ষণে বানিয়াচং উপজেলার জনজীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে। বর্ষার আগাম এই রূপ যেন সাধারণ মানুষের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তাঘাটে জলাবদ্ধতা, হাওরে ফসলের ক্ষতি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ায় এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বৃষ্টির তোড়ে স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক কাজকর্ম, আর ভোগান্তি এখন ঘরে ঘরে।

টানা বৃষ্টির ফলে উপজেলার প্রধান প্রধান সড়কসহ অলিগলি এখন কাদা ও জলে একাকার। অনেক এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল না থাকায় বৃষ্টির পানি জমে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। রিকশা, সিএনজি ও ইজিবাইক চালকরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন, ফলে প্রায়ই ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনা। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা ভিজে একাকার হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, আবার অনেকেই জলাবদ্ধতার কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছে না।

টানা বৃষ্টির সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে রিকশাচালক, ভ্যানচালক এবং দিনমজুররা কাজে বের হতে না পেরে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।  অটো রিকশাচালক সুুহেল  মিয়া বলেন, “বৃষ্টি থামার নাম নেই। সারাদিন ভিজে কাজ করলে জ্বর আসবে, আবার ঘরে বসে থাকলে চুলা জ্বলবে না। পেটের দায়ে ভিজেই গাড়ি চালাচ্ছি, কিন্তু রাস্তায় মানুষ নেই।” হাট-বাজারের ফুটপাতগুলোতে বসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও তাদের মালামাল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

বড়বাজারের ক্ষুদ্র কাঁচামাল বিক্রেতা মো. রহমত আলী (৫০)  বলেন-“বাবা, বৃষ্টির লাইগা গত তিনদিন ধইরা বাজারে মানুষ নাই। আইজকা যে সবজিগুলা আনছি, সেটা কাদা আর পানিতে পইচা যাইতাছে। লাভের কথা তো বাদই দিলাম, পুঁজি বাঁচানোই এখন দায় হইয়া দাঁড়াইছে। আমরার মতো গরিব মাইনষের পেটে এই বৃষ্টি লাথি মারতাছে।”

নতুুুনবাজারের চাল ও মুদি মাল ব্যবসায়ী শ্রী সুধীর দাস (৪৫) বলেন,  “সারাদিন বৃষ্টি  থাকে। কাস্টমার আইবো কেমনে? গুদামে পানি ঢুইকা কয়েক বস্তা চাল ভিজা গেছে। এমনে বৃষ্টি চলতে থাকলে তো আমরাা দোকান বন্ধ কইরা ঘরে বইসা থাকা ছাড়া উপায় নাই। বড় লোকসান হইয়া গেল এইবার।”

আদর্শ বাজারের কাপড়ের দোকানের মালিক  আব্দুল্লাহ আল মামুন (৩৮),বলেন-“সামনে ঈদের মৌসুম আসতেছে, ভাবছিলাম বেচাকেনা ভালো হইবো। কিন্তু এই বৃষ্টি তো থামার নামই নাই। বৃষ্টির ছাঁটে আর ভ্যাপসা গরমে অনেক দামি কাপড় নষ্ট হওয়ার জোগাড় হইছে। সারাদিন দোকানে বইসা থাকি, বুনো মাছি মারা ছাড়া আর কোনো কাম নাই।”

বড়বাজার মাছ বাজারের আড়তদার নুরু মিয়া (৫২), বলেন- “বৃষ্টির কারণে জেলেরা মাছ ধরতে পারতাছে না, আবার আমরাও ঠিকমতো মাল সাপ্লাই দিতে পারতাছি না। বাজারে মাছের আমদানি কম, তাই দামও চড়া। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় মাছ পইচা গন্ধ হইতাছে। লস কার হইতাছে? আমাদের ব্যবসায়ীদেরই তো।”

অন্যদিকে বানিয়াচংয়ের বিস্তৃত হাওর এলাকায় ধান কাটার এই মৌসুমে টানা বৃষ্টি কৃষকদের জন্য মরণকামড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠে কেটে রাখা ধান বৃষ্টির পানিতে ডুবে পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। শ্রমিকরা বৃষ্টির কারণে ধান কাটতে পারছে না, আর যারা কাটছে তারা মাড়াই করার জন্য শুকনো জায়গা পাচ্ছে না। কৃষকদের চোখেমুখে এখন কেবলই আশঙ্কার ছায়া। এক কৃষক বলেন, “সারা বছরের খোরাক এই ধান। বৃষ্টি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে সব ধান হাওরেই শেষ হয়ে যাবে।”

টানা বৃষ্টির ফলে জমাটবদ্ধ পানিতে মশার প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক স্থানে ড্রেনের ময়লা জল রাস্তার ওপর উঠে আসায় এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা পানিবাহিত ও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই তাদের এই নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষকদের সহায়তা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুম খোলার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রশাসনের।

টানা বৃষ্টি প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম হলেও, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে তা জনভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাওরের ধান রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতির এই বৈরিতার মাঝেও মানুষের নিরাপত্তা ও খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা