• বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৪ পূর্বাহ্ন
Headline
শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে সম্প্রীতির ওপর গুরুত্ব দিলেন জেলা প্রশাসক হবিগঞ্জে অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে প্রশাসন-পুলিশের সচেতনতামূলক কর্মশালা লাখাইয়ের বামৈ বড় বাজারে সিসিটিভি ক্যামেরা উদ্বোধন করলেন ওসি শরীফ আহমেদ মাদক-জুয়া ও চুরি প্রতিরোধে লাখাইয়ে পুলিশের উঠান বৈঠক হবিগঞ্জে সনাতন বিদ্যার্থী সংসদের উদ্যোগে শারদ বস্ত্র বিতরণ বানিয়াচংয়ে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা দিলেন এমপি সাখাওয়াত হাসান শিক্ষকরা দলীয়করণে জড়িয়ে পড়লে পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন ব্যাহত হবে : মতবিনিময় সভায় ডা.জীবন এমপি ২৪ বছরের বন্দিজীবনের অবসান : নতুন জীবনের পথে কয়েস আহমেদ হবিগঞ্জে শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী ও শিশু অধিকার দিবসের উদ্বোধন ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে বাড়ি ফেরেনি মাদ্রাসাছাত্র জিহাদ !

রাগ করলা ? রাগ কইরেন না

বিশেষ প্রতিনিধি / ২৪৩ Time View
Update : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ধর্ষণের ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি আমাদের সামাজিক, নৈতিক ও মানসিক অবক্ষয়ের একটি ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি। আমরা প্রতিদিন ক্ষোভ প্রকাশ করি, শাস্তি চাই, মানববন্ধন করি—কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করি, “এই পরিস্থিতি তৈরিতে আমাদের সমাজের কোনো দায় নেই তো?” আমার মনে হয়, দায় আছে। এবং সেই দায় শুধু অপরাধীর একার নয়; পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পরিবেশ—সবকিছু মিলেই আজকের এই ভয়াবহ বাস্তবতা তৈরি করেছে।
প্রথমত, আমাদের সমাজে নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, অনেক সময় “লিঙ্গ” হিসেবেই বেশি দেখা হয়। মেয়ে সন্তান জন্মের পর থেকেই বৈষম্য শুরু হয়। এখনও অনেক পরিবারে ছেলে সন্তান জন্ম নিলে আনন্দ বেশি হয়, আর মেয়ে হলে বলা হয়—“আচ্ছা, আল্লাহ যা দেন ভালোই দেন।” অর্থাৎ, জন্মের পর থেকেই মেয়েরা সমান মর্যাদা পায় না। যে সমাজ নারীর মূল্য ছোটবেলা থেকেই কমিয়ে দেয়, সে সমাজে নারীর প্রতি সম্মানবোধ গড়ে ওঠা কঠিন।
দ্বিতীয়ত, আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যেও নারীর প্রতি অসম্মান ঢুকে গেছে। আমরা রাগ করলে, গালি দিলে, কাউকে অপমান করতে গেলেও নারীর শরীরকে টেনে আনি। জনসম্মুখে অশ্লীল স্লোগান, ইঙ্গিতপূর্ণ কথা, নারীর শরীর নিয়ে হাসাহাসি—এসব ধীরে ধীরে মানুষের মনকে অসাড় করে দেয়। একসময় মানুষ নারীকে একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে না দেখে, কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে ভাবতে শুরু করে। এটাই ভয়ংকর।
তৃতীয়ত, আমরা যৌনতা নিয়ে কখনো সুস্থ শিক্ষা দিই না, কিন্তু অসুস্থ কৌতূহলকে চারদিকে ছড়িয়ে রাখি। পরিবারে এই বিষয়ে কথা বলা নিষিদ্ধ, শিক্ষায় সচেতনতা কম, অথচ মোবাইল, ইন্টারনেট, বিভিন্ন কনটেন্টের মাধ্যমে বিকৃত যৌনতা খুব সহজে পৌঁছে যাচ্ছে শিশু-কিশোরদের কাছেও। ফলে অনেকের মধ্যে বিকৃত মানসিকতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে সম্মতি, সম্মান ও মানবিকতার শিক্ষা অনুপস্থিত।
চতুর্থত, পরিবারেও সমস্যা আছে। অনেক সন্তান ছোটবেলা থেকে শিখে—“ছেলে মানুষ, একটু এমন করতেই পারে।” এই “এমন করতেই পারে” মানসিকতাই পরে ভয়ংকর রূপ নেয়। যে ছেলে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে, অশ্লীল মন্তব্য করে, তাকে পরিবার বা সমাজ ঠিকভাবে থামায় না। বরং অনেক সময় এটাকে “দুষ্টুমি” বলে এড়িয়ে যায়। অথচ অপরাধের শুরু সেখান থেকেই।
পঞ্চমত, সামাজিক ও আইনি দুর্বলতাও বড় কারণ। অনেক ধর্ষক রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা বা টাকার কারণে পার পেয়ে যায়। বিচার দীর্ঘ হয়, ভুক্তভোগীকেই উল্টো প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এতে অপরাধীরা সাহস পায়, আর সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের উপর আস্থা হারায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমরা নারীর পোশাক, চলাফেরা, রাতের বের হওয়া নিয়ে বেশি আলোচনা করি; কিন্তু একজন পুরুষের চরিত্র, দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুব কম কথা বলি। একজন মানুষের অপরাধের দায় কখনোই ভুক্তভোগীর ওপর চাপানো যায় না। ধর্ষণের মূল কারণ হলো বিকৃত মানসিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নারীর প্রতি অসম্মান। ধর্ষণ বন্ধ করতে শুধু কঠোর আইন করলেই হবে না।
প্রয়োজন—• পরিবারে ছেলে-মেয়েকে সমান মর্যাদা দেওয়া • ছোটবেলা থেকেই নারীর প্রতি সম্মান শেখানো • সুস্থ যৌন শিক্ষা ও সচেতনতা তৈরি করা • অশ্লীলতা ও নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করা • দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা • ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চা করা
আমরা যদি সত্যিই পরিবর্তন চাই, তাহলে শুধু অপরাধীর শাস্তি চাইলেই হবে না; সমাজের সেই মানসিকতাগুলোকেও বদলাতে হবে, যেগুলো একজন অপরাধী তৈরি করে। কারণ ধর্ষক হঠাৎ করে জন্ম নেয় না—সমাজের ভুল শিক্ষা, বিকৃত সংস্কৃতি, নীরব সমর্থন আর অবহেলার মধ্য দিয়েই সে তৈরি হয়।
লেখক- এডভোকেট মুন্না তালুকদার
জজ কোর্ট, হবিগঞ্জ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা