স্বপ্ন ছিল একটু ভালো থাকার, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর। প্রিয়জনদের দুঃখ ঘোচাতে, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে কেউ হয়তো জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ধারদেনা করেছেন, আবার কেউ পরিবারের শেষ সম্বলটুকু তুলে দিয়েছেন দালালের হাতে।
বুকভরা আশা নিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন অজানা এক পথে। কিন্তু সেই স্বপ্নের শেষ কোথায়—এখন তা জানেন না কেউ। ওপারে পৌঁছানোর খবর নেই, নেই কোনো নিশ্চিত বার্তা। শুধু অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা আর বুকফাটা কান্না। আবারও স্বজন হারানোর শঙ্কায় ভারী হয়ে উঠেছে হবিগঞ্জের ভাটির জনপদের আকাশ-বাতাস।
গত বছর হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জের ৩৭ জন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার ক্ষত এখনো শুকায়নি। সেই ঘটনার স্মৃতি, স্বজনদের আহাজারি আর ফিরে আসার আকুতি আজও অনেকের মনে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। এরই মধ্যে আবারও নতুন করে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এই জনপদে।
এবার লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে ‘গেম’ দেওয়ার পর মোট ৭৩ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে হবিগঞ্জের ১০ জন রয়েছেন বলে জানা গেলেও এখন পর্যন্ত তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে নতুন করে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন সম্ভাব্য নিখোঁজদের স্বজনেরা।
প্রতিটি ফোনকল যেন এখন একেকটি আশার আলো। অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলেই বুক কেঁপে ওঠে—এই বুঝি প্রিয়জনের খবর এলো! আবার কোনো খবর না পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাত পার করেন পরিবারের সদস্যরা। কারও মা হয়তো সন্তানের পথ চেয়ে আছেন, কারও স্ত্রী অপেক্ষা করছেন স্বামীর ফেরার, আবার কারও সন্তান জানেই না—তার বাবা কোথায়, কেমন আছেন।
ভাটির জনপদের অনেক পরিবারের কাছে বিদেশযাত্রা কেবল উন্নত জীবনের স্বপ্ন নয়; এটি দারিদ্র্য থেকে মুক্তির শেষ চেষ্টা। সেই চেষ্টাই যখন অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রায় পরিণত হয়, তখন শুধু একজন মানুষ নিখোঁজ হন না—তাঁর সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভরসা আর বেঁচে থাকার অবলম্বন।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, নিখোঁজদের পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় স্বজনেরা এখনো জানেন না তাঁদের প্রিয়জনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে। তাঁরা কি কোথাও আটকে আছেন, কোনোভাবে বেঁচে আছেন, নাকি গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে হারিয়ে গেছেন—কোনো প্রশ্নেরই মিলছে না উত্তর। এই অনিশ্চয়তাই যেন তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা।
গত বছরের ৩৭ জন নিখোঁজ হওয়ার স্মৃতি যখন এখনো স্বজনদের তাড়া করে বেড়ায়, তখন নতুন করে ১০ জনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পুরো এলাকায় উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। একই জনপদে বারবার এমন ঘটনা কেবল কয়েকটি পরিবারের সংকট নয়; এটি প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা অসংখ্য মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
কেন জীবিকার সন্ধানে মানুষকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াতে হচ্ছে? কারা তাঁদের এই বিপজ্জনক যাত্রায় প্রলুব্ধ করছে? তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো নিখোঁজ ৭৩ জনের অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, তাঁদের মধ্যে হবিগঞ্জের ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং তাঁদের সন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি স্বজনদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজনে তাঁদের সহযোগিতা করাও জরুরি।
ভাটির জনপদের মানুষের এখন একটাই প্রার্থনা—আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়, আর কোনো স্ত্রীকে যেন স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় অনিশ্চয়তার দিন গুনতে না হয়, আর কোনো সন্তানকে যেন বাবার মুখ দেখার আশায় কাঁদতে না হয়।
সমুদ্রের ওপারে কী ঘটেছে, তার উত্তর এখনো অজানা। তবু স্বজনেরা আশা ছাড়তে চান না। তাঁরা বিশ্বাস করতে চান, প্রিয় মানুষগুলো হয়তো কোথাও আছেন, হয়তো কোনো এক মুহূর্তে ফোন করে বলবেন—‘আমি বেঁচে আছি, ভালো আছি।’
এই আশাটুকু নিয়েই কাটছে তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত।