হবিগঞ্জের বানিয়াচং-শিবপাশা রোডের আইঞ্জন নামক এলাকায় একটি পুকুরের পাড়ে ব্যাটারি পুড়িয়ে শিশা (সীসা) তৈরির কারখানা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাটারি পুড়িয়ে ধাতু আলাদা করার এ প্রক্রিয়ায় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, গ্যাস ও রাসায়নিক উপাদান আশপাশের পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ঘটনায় স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কারখানাটি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও দুর্গন্ধের কারণে এই রোড দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী ও পথচারীদেরও নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারি পোড়ানোর সময় ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে সড়ক দিয়ে চলাচলকারী মানুষের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে চোখ জ্বালাপোড়া, কাশি, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষের জন্য এ পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ব্যবহৃত ব্যাটারি পুড়িয়ে সেখান থেকে সীসাসহ বিভিন্ন ধাতু সংগ্রহের প্রক্রিয়া পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যাটারিতে থাকা সীসা, ক্যাডমিয়াম, লিথিয়াম ও বিভিন্ন ধরনের অ্যাসিড এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান অনিরাপদভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হলে তা বাতাস, মাটি ও পানিকে দূষিত করতে পারে। বিশেষ করে খোলা জায়গায় ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীসার সংস্পর্শে এলে মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ব্যাটারির রাসায়নিক বর্জ্য পুকুরের পানি কিংবা আশপাশের মাটিতে মিশে গেলে তা জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
পুকুরের পাড়ে এ ধরনের কারখানা পরিচালিত হয়ে থাকলে সেখানকার পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারখানাটিতে কীভাবে ব্যাটারি প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারখানার কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তাঁরা এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে কারখানাটির মালিকানা, ব্যাটারি পোড়ানোর প্রক্রিয়া, শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরিবেশগত অনুমোদনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে হবিগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. ইউসুফ আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক শ্রী হরিপদ চন্দ্র দাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে লোকমুখে এ বিষয়ে শুনেছেন বলে উল্লেখ করেন। কারখানার মালিকের নাম ও মোবাইল নম্বর পাওয়া গেলে তাঁকে নোটিশ পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য জানতে বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মেহরাব হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। একই সঙ্গে কারখানাটির কার্যক্রম পরিবেশগত আইন ও বিধিমালা মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।