হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা বিএনপিতে একের পর এক অভিযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতাদের বক্তব্য ঘিরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দলীয় অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে ফেসবুকে অভিযোগ তোলায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছেন দলের নেতাকর্মীরা। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সম্প্রতি বানিয়াচং উপজেলা বিএনপির মনোনীত সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তফা আল হাদী দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বরাদ্দ দেওয়া অনুদান বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, অনুদান বণ্টনে একটি সিন্ডিকেটের কারণে পূজারিরা ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া ফেসবুকে দেওয়া পৃথক পোস্টে তিনি ‘৯ শহীদের সঙ্গে বেইমানি, অতঃপর দালালি—মাফ করবে না বানিয়াচংবাসী’ এবং ‘আবারও মামলা, নেতৃত্বে উদাসীনতা, ভোগান্তিতে নিরপরাধ মানুষ, দায় নেবে না দল’—এমন মন্তব্য করেন।
তাঁর এসব পোস্ট ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারদলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজেদের মতামত তুলে ধরে পোস্ট করছেন। এসব পোস্টে মোস্তফা আল হাদীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি এবং তাঁকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনা কিংবা জবাবদিহিতার দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দলীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে—তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে, দুর্গাপূজার অনুদান বণ্টনে অনিয়ম, ৯ শহীদের বিচার এবং মামলা-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ও সংবেদনশীল বিষয়। এসব অভিযোগের সত্যতা থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করাও জরুরি।
এদিকে বানিয়াচং উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মাধব দেব ও সাধারণ সম্পাদক নূপুর দেব জানিয়েছেন, পূজার বরাদ্দে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। তাঁদের এই বক্তব্য অন্য একজন ব্যক্তি নিজের ফেসবুক পোস্টে তুলে ধরেছেন। ফলে বরাদ্দ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগ এবং পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের বক্তব্যকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
একদিকে বরাদ্দ বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের অনিয়ম না হওয়ার বক্তব্য—দুই ধরনের অবস্থানের মধ্যে প্রকৃত চিত্র কী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে বরাদ্দ বণ্টনের নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট উপকারভোগীদের বক্তব্য এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের তথ্য যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
দলীয় দায়িত্বশীল পদে থেকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রকাশ্যে বারবার অভিযোগ তোলা কতটা সমীচীন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হলে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হতো। অন্যদিকে, অভিযোগগুলো সত্য হলে সেগুলো উপেক্ষা না করে যথাযথ তদন্ত ও সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়াও নেতৃত্বের দায়িত্ব।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন, অতীতে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দলীয়ভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে বর্তমানের এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি অনেকাংশে এড়ানো যেত। অভিযোগ অমীমাংসিত থাকলে সাধারণ মানুষের কাছে দলের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থায় বানিয়াচং উপজেলা বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে প্রত্যাশা, তাঁরা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। একই সঙ্গে মোস্তফা আল হাদীর বক্তব্যের বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা গ্রহণ এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টির গ্রহণযোগ্য সমাধান করবেন।
বিষয়টি নিয়ে পোস্টদাতা ও উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আলহাজ্ব মোস্তফা আল-হাদীর সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ না করায় কথা বলা সম্ভব হয়নি ।
এ বিষয়ে জানতে বানিয়াচং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নকীব ফজলে রকিব মাখনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে বানিয়াচং উপজেলা বিএনপির সভাপতি মুজিবুল হোসাইন মারুফের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমি দেখেছি। অনেকেই দেখলাম, তাঁকে নিয়ে নানা রকম ভাষায় কটূক্তি করে যাচ্ছেন। দায়িত্বশীল পদে থেকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে এমনটা করা যায় না। এ বিষয়ে তাঁকে শোকজ করা হবে।”
উপজেলা বিএনপির সভাপতির এ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বিষয়টি দলীয় নেতৃত্বের নজরে এসেছে এবং এ নিয়ে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, শোকজের মাধ্যমে দলীয়ভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট নেতা তাঁর বক্তব্যের বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেন।