হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে বর্তমান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সমর্থকদের মধ্যে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে।
সোমবার (৮জুন) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার ৭নং বড়ইউড়ি ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। প্রায় ২ ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘাতের জেরে আশেপাশের ৯টি গ্রামের মানুষ দা-লাঠিসোঁটাসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে নবীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদেরকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
বিরোধের নেপথ্যে : আদালতের আদেশ বনাম চেয়ার ছাড়ার অনীহা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বড়ইউড়ি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কপিল উদ্দিনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আইনি ও রাজনৈতিক বিরোধ চলছিল।
সম্প্রতি উচ্চ আদালতের এক আদেশে চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদকে স্বপদে বহাল রাখার রায় দেওয়া হয়। আদালতের এই নির্দেশনা অনুযায়ী ফরিদ আহমেদ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব বুঝে নিতে গেলে বিপত্তি ঘটে। উচ্চ আদালতের রায় অমান্য করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কপিল উদ্দিন কোনোভাবেই দায়িত্ব ছাড়তে নারাজ হন। এই নিয়ে দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয় এবং একপর্যায়ে তা ৯ গ্রামের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষের ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতি
সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর চড়াও হয়। ইটপাটকেল ও দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে দুই পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বহাল হওয়া চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদের বক্তব্য
উচ্চ আদালতের রায়ে নিজের পদে বহাল হওয়া চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ সংঘর্ষের পর গণমাধ্যমকে বলেন- মাননীয় উচ্চ আদালত আমার পক্ষে রায় দিয়েছেন এবং আমাকে স্বপদে বহাল থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি আজ প্রশাসনকে জানিয়ে পরিষদে এসেছিলাম। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কপিল উদ্দিন আদালতের সেই আদেশ সরাসরি অমান্য করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছেন। তিনি এবং তার অনুসারীরা পরিকল্পিতভাবে আমার লোকজনের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে। আমি শান্তির পক্ষে, কিন্তু আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙুুলি দেখিয়ে এভাবে বিশৃঙ্খলা সৃৃষ্টি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমি প্রশাসনের কাছে এই ন্যক্কারজনক হামলার বিচার দাবি করছি।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কপিল উদ্দিনের বক্তব্য
অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কপিল উদ্দিন তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন- আদালতের আদেশের একটি আইনি প্রক্রিয়া ও চেইন অব কমান্ড আছে। জেলা বা উপজেলা প্রশাসন থেকে আমাকে অফিশিয়ালি দায়িত্ব হস্তান্তরের কোনো লিখিত নির্দেশনা আজ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সরকারি নিয়ম অমান্য করে ফরিদ আহমেদ তার লোকজন নিয়ে জোরপূর্বক ইউনিয়ন পরিষদে ঢুকে ক্ষমতা দখল করতে চান। আমাদের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, অথচ উনার লোকেরাই বহিরাগত সন্ত্রাসী এনে প্রথমে আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কিছুই করছি না, কিন্তু জোর জবরদস্তি আমরা মেনে নেব না।
পুলিশের হস্তক্ষেপ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ
খবর পেয়ে বানিয়াচং থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বেশ কিছু সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। বর্তমানে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
ঘটনার বিষয়ে বানিয়াচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ নাজমুুল হক জানান-উচ্চ আদালতের আদেশ ও দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কপিল উদ্দিনের লোকজনের মধ্যে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের বেশ কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে। আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন বা আইনি বিষয়গুলো দেখার জন্য নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ রয়েছে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ কাউকেই দেওয়া হবে না। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সবশেষ অবস্থা
এলাকায় এখনো থমথমে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেনি।