• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন
Headline
সাতছড়িতে মাটির নিচে মিলল ৬ পিস্তল, ৭ ম্যাগাজিন ও ২২ রাউন্ড গুলি হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের সংঘর্ষ-আহত অন্তত ১৫ ৭৪ লাখ টাকার বৃত্তি পেলেন হবিগঞ্জের জেমি হবিগঞ্জে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নারী সমাবেশ হবিগঞ্জে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে CRVS কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবিগঞ্জে ব্যাংক-বিকাশ প্রতারণা চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার বানিয়াচংয়ে জেলা পরিষদের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি  রোমাঞ্চকর পেনাল্টি শুটআউট জয়ে ফাইনালে বানিয়াচং “এসআই সন্তোষকে কিন্তু জ্বালাই দিয়েছিলাম” বলা সেই মাহদী পুলিশের হাতেই আটক নারী শিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছে সুফিয়া মতিন মহিলা কলেজ-ডা. জীবন এমপি

আলোর দিশারি : স্মরণে শিক্ষক সিরাজ উদ্দিন খান এবং এক চিরন্তন জীবনদর্শন

বিশেষ প্রতিনিধি / ১৩৪ Time View
Update : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬

একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান বিতরণ করে না, বরং তৈরি করে জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর। বানিয়াচংয়ের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ এল আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ঠিক তেমনই এক আলোকবর্তিকা। আর এই আলোর দিশারিকে যারা যুগ যুগ ধরে প্রজ্জ্বলিত রেখেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম এক পরম শ্রদ্ধেয় নাম সিরাজ উদ্দিন খান স্যার। তিনি কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন একজন দার্শনিক, পথপ্রদর্শক এবং মানুষ গড়ার কারিগর।

ক্লাসরুম থেকে জীবনের পাঠশালা

সিরাজ উদ্দিন খান স্যারের ক্লাসে বসা মানে শুধু মুখস্থ বিদ্যার চর্চা ছিল না। তিনি যখন ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়াতেন, তখন শুষ্ক অধ্যায়গুলোও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। তবে স্যারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি পাঠ্যবইয়ের সীমানা পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যেতেন জীবনের বাস্তব পাঠশালায়। কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি কীভাবে হতে হয়, সততা ও নিষ্ঠার সাথে কীভাবে জীবন ধারণ করতে হয়, সেই মূল্যবোধ তিনি পরম মমতায় বুনে দিতেন প্রতিটি ছাত্রের হৃদয়ে।

বিশ্ব ইতিহাসের গল্পে অনুপ্রেরণার বীজ বপন

সিরাজ উদ্দিন খান স্যারের পাঠদানের ধরণ ছিল আর সবার চেয়ে আলাদা। তিনি শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকতেন না। পড়ালেখার একঘেয়েমি দূর করতে এবং ছাত্রদের মনে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাতে তিনি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে গল্প বলতেন। সেই গল্পগুলো কোনো কাল্পনিক রূপকথা ছিল না; সেগুলো ছিল বিশ্ব ইতিহাসে স্থান করে নেওয়া নামকরা মনীষী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং সমাজের প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য ব্যক্তিদের জীবনসংগ্রামের বাস্তব কাহিনী।

স্যার অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় ফুটিয়ে তুলতেন কীভাবে সাধারণ অবস্থান থেকে কঠোর পরিশ্রম আর সততার জোরে একেকজন মানুষ ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে গেছেন। আব্রাহাম লিংকন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো মহৎ প্রাণদের জীবনের ব্যর্থতা ও তা পেরিয়ে সফল হওয়ার গল্প।

এই গল্পগুলো ক্লাসের ছাত্রদের মনে জাদুর মতো কাজ করত। স্যারের মুখে মনীষীদের এই জীবনকাহিনি শুনে ছাত্ররা শুধু আনন্দই পেত না, বরং তাদের ভেতরে এক ধরণের ইতিবাচক জেদ চেপে বসত—”ওরা পারলে, আমরা কেন পারব না?” বানিয়াচংয়ের মতো মফস্বল শহর থেকে ছাত্রদের চিন্তা ও চেতনাকে বিশ্বদরবারে প্রসারিত করার এই অনন্য কৌশল স্যারকে আর সবার চেয়ে আলাদা এবং অনন্য করে তুলেছিল।

এক চিরন্তন উক্তি: “যাহা কিছু কররে বান্দা আপনার লাগিয়া”

সে সময়ে স্যারের ক্লাসে অংশ নেওয়া প্রত্যেক ছাত্রের স্মৃতিতে একটি বাক্য আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। জীবনের গভীর সত্যকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করতে স্যার প্রায়শই বলতেন: “যাহা কিছু কররে বান্দা আপনার লাগিয়া।”

এটি কেবল একটি উক্তি ছিল না, এটি ছিল স্যারের জীবনের সেরা দর্শন। এই একটি লাইনের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থীদের মগজে ও মননে অত্যন্ত সহজ করে একটি চিরন্তন সত্য ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।

তুমি আজ যা শিখছ, যে পরিশ্রম করছ কিংবা যে আচরণ করছ—তার ভালো বা মন্দ ফলাফল দিনশেষে তোমার নিজের কাছেই ফিরে আসবে। অবহেলা বা ফাঁকিবাজি দিয়ে সাময়িক পার পাওয়া গেলেও, নিজের ক্ষতি নিজেই করা হয়।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে স্যারের সেই ছাত্ররা যখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিষ্ঠিত, তারা একবাক্যে স্বীকার করেন—জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি সাফল্যে এবং সংকটে স্যারের এই উক্তিটি তাদের সঠিক পথ দেখিয়েছে।

শতবর্ষী এল আর স্কুলের গর্বিত অধ্যায়

এল আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে সিরাজ উদ্দিন খান স্যারের মতো শিক্ষকরাই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে নৈতিক শিক্ষার এমন এক মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন, যার সুফল বানিয়াচং তথা পুরো দেশ আজও ভোগ করছে।

সময় বয়ে গেছে, ক্লাসরুমের সেই চকমাটি আর ব্ল্যাকবোর্ড হয়তো বদলে গেছে, কিন্তু সিরাজ উদ্দিন খান স্যারের শেখানো জীবন দর্শনের আলো আজও নেভেনি। তিনি তাঁর কর্ম, আদর্শ এবং সেই যুগান্তকারী উক্তির মাধ্যমে এল আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে এবং হাজারো ছাত্রের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন এক পরম শ্রদ্ধেয় ‘আলোর দিশারি’ হয়ে।

ওপারে ভালো থাকুন স্যার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা