দীর্ঘ ৩ বছরের তদন্ত শেষে বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নের মশাকলি গ্রামের আলোচিত সুজিত দাস হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে সিআইডি । তার আগে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন পিবিআই’র তদন্ত কর্মকর্তা দীর্ঘ তদন্তে মামলার প্রধান আসামী হরিলাল দাসসহ ২১ জনকে অব্যাহতি ও সুবিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান জয় কুমার দাশের পুত্র দীপ্তজিৎ দাশ বাঁধন সহ ৪ জনের জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
পরবর্র্তীতে সিআইডি ১৯ জনকে বাদ দিয়ে চুড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এর পূর্বে বাদি পক্ষ পিআইবির অভিযোগের উপর নারাজি দিলে সেটা অধিকতর তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য সিআইডিকে নির্দেশনা দেয়া হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে হবিগঞ্জের সহকারি পুলিশ সুপার (সিআইডি) মোল্যা মনির হোসেন প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। প্রতিবেদনে ভিকটিম সুজিত দাসকে গলা টিপে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নের মশাকলি গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে দু’পক্ষের সংঘর্ষে সুব্রত দাশ (৩০) নামে এক ব্যাক্তি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। অপর দিকে প্রতিপক্ষের আহত সুজিত দাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট নেয়ার পথে তার মৃত্যু হলে দু’পক্ষ থেকে দু’টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। নিহত সুজিতের স্ত্রী দ্রোপদী রানী দাস বাদী হয়ে ৬৪ জনের নাম উল্লেখ করে বানিয়াচং খানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এদিকে সুজিত হত্যা মামলায় ময়না তদন্তের রিপোর্টে সুজিতকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসার সাথে সাথে নড়ে চড়ে বসে সুজিত হত্যা মামলার আসামী পক্ষ। তারা মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে আবেদন জানালে মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইতে প্রেরন করা হয়। এদিকে সুব্রত হত্যা মামলাটিও তদন্তের জন্য পিবিআইতে প্রেরণ করা হয়। পিবিআই সুজিত হত্যা মামলার তদন্ত শুরু করলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা বাপ্পু লাল বহ্নি গত দু’বছরে এ মামলার তদন্তকালে ৩৫ জন স্বাক্ষীর স্বাক্ষ্য গ্রহন করেন। এছাড়া তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় সুজিত হত্যা প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসে। তদন্তে উল্লেখ করা হয় ঘটনার দিন নিহত সুজিত দাশ সংঘর্ষে আহত হয়ে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাতের কনুই ও পায়ে ইটের আঘাতে সামান্য আহত হলেও তাকে উন্নত চিকিৎসার নামে সিলেট নেয়া হয়। এবং সিলেট নেয়ার সময় পথিমধ্যেই প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য সুজিতকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তারই লোকজন।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় মশাকলি গ্রামের একটি বিরোধীয় ভূমি নিয়ে সুবিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান জয় কুমার দাশের পিতা হর কুমার দাস ও শনি দাস গংদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এ বিরোধের জের ধরে দু’পক্ষের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
গত ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলেই শনি দাস গংদের পক্ষের সুব্রত দাস নিহত হয়। এদিকে ইউপি চেয়ারম্যান জয় কুমার দাসের লোকজন প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য নিজেরাই সুজিতকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। সুজিত দাসকে উন্নত চিকিৎসার নামে এ্যাম্বুলেন্স যোগে সিলেট রেফার্ড করলে আসামী দিপ্তজিৎ দাস বাঁধন, বাঁধনের বন্ধু, জয়পাল, তানভীর হোসেন ও এ্যাম্বুলেন্স চালক কাওসার মিলে ষড়যন্ত্র করে তারা ভিকটিম সুজিত দাসকে সিলেট নিয়ে যাবার সময় হত্যা করে। যাতে পরবর্তীতে মামলা দায়ের করার সময় উভয় পক্ষের মামলা সমান সমান হয়।
তদন্তে অরো উল্লেখ করা হয়, ঐ দিন দুপুর ১২.৪৭ মিনিটে বাঁধন দাস, জয় পাল, তানভীর হোসেন ও এ্যাম্বুলেন্স চালক কাওসার ভিকটিম সুজিতকে নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সিলেট যাবার পথে সুজিত দাস সহ এ্যাম্বুলেন্সটিকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়্যোম্বুলে ভিকটিম সুজিত দাসকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
সুজিতের মৃত্যু নিশ্চিত করতে স্ক্রুড্রাইভার দিয়ে গলায় আঘাত করে সুজিতের মৃত্যু নিশ্চিত করে। ঐ দিন সন্ধ্যা ৭.১ মিনিটে আসামী তানভীর এবং কাওসার ভিকটিম সুজিতের মৃতদেহ তার কোন নিকট আত্মীয়দের ছাড়াই হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে রেখে চলে যায়।
এদিকে পিবিআই তদন্তে নিহত সুজিতের স্ত্রী দ্রোপদী দাস বাদী হয়ে ৬৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল। সেই মামলার প্রধান আসামী হরিলাল দাস সহ ২১ জনকে অব্যাহতি দেয়ার পাশাপাশি দীপ্তজিৎ দাশ বাঁধন, কাওসার আহম্মেদ, জয় পাল ও তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে সুজিত হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
অন্য দিকে একই সময়ে পিবিআই তদন্ত অফিসার আব্দুল আহাদ সুব্রত দাস হত্যা মামলারও আদালতে দাখিল করেছেন। এ মামলায় সুবিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান জয় কুমার দাসসহ ৫৬ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে আদালতে।
দাখিল করার পর বিজ্ঞ আদালত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান জয় কুমার দাসসহ কয়েকজনের নামে বিগত এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখ গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করেন। বর্তমানে জয়কুমার দাসসহ আসামিরা পলাতক রয়েছে।