কিছু মানুষ চলে গিয়েও সমাজ, সংস্কৃতি আর মানুষের মনের মণিকোঠায় এমনভাবে দাগ কেটে যান, যাঁদের স্মৃতি কখনো ম্লান হয় না। তেমনই এক কালজয়ী ও মহীরুহ ব্যক্তিত্ব ছিলেন বানিয়াচং এল আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক জনাব আব্দুল হাই খান স্যার। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, বহু দিন হলো পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু বানিয়াচংয়ের আনাচে-কানাচে, খেলার মাঠে কিংবা কোনো পঞ্চায়েতি সালিশে আজও তাঁর শূন্যতা গভীরভাবে অনুভূত হয়।
আব্দুল হাই খান স্যার ছিলেন একজন আপাদমস্তক গুণী শিক্ষক। এল আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন একাধারে পরম স্নেহময় এবং নিয়মানুবর্তিতার মূর্ত প্রতীক। তবে স্যারের পরিচিতি শুধু ক্লাসরুমের চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন মাঠ কাঁপানো এক ক্রীড়াব্যক্তিত্ব।
ফুটবল খেলার মাঠে যখনই তিনি রেফারি হিসেবে নামতেন, পুরো মাঠ যেন এক যাদুকরী আকর্ষণে শান্ত হয়ে যেত। তাঁর ঠোঁটে থাকা বাঁশির সুর আর হাতের ইশারা ছিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। মাঠে যতই উত্তেজনা থাকুক না কেন, আব্দুল হাই খান স্যারের একটি বাঁশির ফুঁ পুরো মাঠকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসত। খেলোয়াড় থেকে শুরু করে দর্শক—সবার মাঝেই তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার এক অঘোষিত ও স্বতঃস্ফূর্ত রেওয়াজ ছিল।
শিক্ষকতা আর মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে আব্দুল হাই খান স্যার হয়ে উঠেছিলেন বানিয়াচংয়ের একজন বিশ্বস্ত ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় পঞ্চায়েত ব্যক্তিত্ব। তাঁর সততা, নিরপেক্ষতা এবং বিচক্ষণতার কারণে সমাজের যেকোনো জটিল বিরোধ বা সালিশ-বিচারে তাঁর ডাক পড়ত সবার আগে। তিনি ছিলেন সমাজকে বেঁধে রাখার এক অদৃশ্য সুতো। লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি যে রায় দিতেন, তা সবাই নির্দ্বিধায় মেনে নিত। তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।”
জনাব আব্দুল হাই খান স্যার কেবল একজন আদর্শ শিক্ষক বা দক্ষ রেফারিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বানিয়াচংয়ের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপাশা মহল্লার ঐতিহ্যবাহী খান বাড়ির এক কৃতি সন্তান। তাঁর বংশীয় মর্যাদা, পারিবারিক শিক্ষা এবং আভিজাত্যের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর পুরো জীবন জুড়ে। খান পরিবারের যে সুখ্যাতি ও গৌরব, তাকে তিনি নিজের সততা, নিষ্ঠা এবং কর্মের মাধ্যমে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। যাত্রাপাশা মহল্লা তথা পুরো বানিয়াচংয়ের গৌরব হিসেবে তিনি আজীবন মাথা উঁচু করে বেঁচে ছিলেন এবং নিজের এলাকাকে সম্মানিত করেছেন।
সময় বয়ে চলে তার নিজস্ব নিয়মে। আব্দুল হাই খান স্যার আজ আমাদের মাঝে সশরীরে অনুপস্থিত। কিন্তু বানিয়াচংয়ের মাটিতে যখনই কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়, যখনই মাঠ ভর্তি দর্শকের কোলাহলের মাঝে রেফারির বাঁশির তীক্ষ্ণ সুর প্রতিধ্বনিত হয়, তখনই ক্রীড়ামোদী মানুষের মনের অজান্তেই ভেসে ওঠে একটি মুখ—আব্দুল হাই খান স্যারের নাম। বাঁশির সুর আর ফুটবল খেলা যেন বানিয়াচংবাসীর কাছে স্যারের স্মৃতির এক জীবন্ত দলিল।
আব্দুল হাই খান স্যারের মতো গুণী শিক্ষকেরা মরেও অমর হয়ে থাকেন তাঁদের কর্মের মাধ্যমে। তিনি বানিয়াচংয়ের ইতিহাসে এমন এক গৌরবময় অধ্যায় রচনা করে গেছেন, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা জোগাবে। সমাজ গড়ার এই কারিগরের প্রতি বানিয়াচংবাসীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা চিরকাল অক্ষুণ্ন থাকবে।