কালের আবর্তে অনেক কিছুই বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু কিছু নিদর্শন নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে জানান দেয় অতীত সমৃদ্ধি আর আভিজাত্যের কথা। এমনই এক ইতিহাসঘেরা স্মৃতির সাক্ষী হয়ে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী ‘গিরিষ বাবুর বাড়ি’। সুরম্য কারুকার্য, সুউচ্চ গম্বুজ আর লাল ইটের সেই জাঁকজমক আজ আর নেই; তবে জীর্ণ দেওালের নোনাধরা প্লাস্টার আর প্রাচীন কাঠামোর প্রতিটা ভাঁজে যেন আজও জমে আছে এক হারিয়ে যাওয়া সোনালী সময়ের গল্প।
স্থানীয় প্রবীণদের মুখে জানা যায়, তৎকালীন জমিদারি আমল ও ব্রিটিশ শাসনের সমসাময়িককালে জলসুখার তৎকালীন ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি গিরিষ চন্দ্রের উদ্যোগে এই বিশাল ভবনটি নির্মিত হয়। ভবনটির নির্মাণশৈলীতে তৎকালীন ঔপনিবেশিক এবং স্থানীয় স্থাপত্যরীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়। বিশাল উঠান, চুন-সুরকির মজবুত গাঁথুনি, উঁচু ছাদ এবং নান্দনিক তোরণ প্রমাণ করে সেই সময়ের রুচিশীলতা ও অভিজাত জীবনযাত্রার কথা।
একসময় এই বাড়িতে বসত জমজমাট আসর। পূজা-পার্বণ, যাত্রাপাল্লা আর বিচার-শালিসে দিনরাত মুখরিত থাকত গিরিষ বাবুর আঙিনা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত এই প্রাসাদতুল্য বাড়িটি এক নজর দেখতে।
সময়ের নিমর্ম কষাঘাতে সেই প্রাণচাঞ্চল্য আজ ইতিহাস। যত্নের অভাব, জলবায়ুর প্রভাব এবং তদারকির অভাবে বাড়িটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ভবনের অনেক জায়গায় ফাটল ধরেছে, ছাদ থেকে খসে পড়ছে প্লাস্টার। ঘরের ভেতরের মূল্যবান কাঠের কাজ এবং কারুকার্যময় দরজা-জানালা ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও এই ধ্বংসাবশেষ দেখতে মাঝে মাঝেই ছুটে আসেন স্থানীয় তরুণ ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ। দেওয়ালের গায়ে হাত রাখলেই যেন পাওয়া যায় অতীত জীবনের স্পন্দন।

জলসুখা গ্রামের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, গিরিষ বাবুর বাড়িটি কেবল একটি পুরোনো দালান নয়, এটি আজমিরীগঞ্জের স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য অংশ। “আমাদের এলাকার এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি যদি দ্রুত সংস্কার বা সংরক্ষণ করা না হয়, তবে অচিরেই এটি মাটির সাথে মিশে যাবে। আগামী প্রজন্ম জানতেও পারবে না তাদের অঞ্চলের সমৃদ্ধ অতীতের কথা।” — স্থানীয় এক প্রবীণ অধিবাসী।
আজমিরীগঞ্জের জলসুখার গিরিষ বাবুর বাড়িটি এখন ইতিহাসের এক বিষাদময় অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সরকারি বা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমই পারে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে। সময় পেরিয়ে গেলেও, সেই পুরোনো দেওয়ালগুলো যেন আজও ফিসফিস করে বলে চলে— ‘আমরাও একদিন প্রাণবন্ত ছিলাম..।
ছবি-দ্যা গ্যালারি