একসময় মানুষের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণে বেশ জনপ্রিয় ছিল মোজাইক পাথর দিয়ে তৈরি পানির ফিল্টার। ঘরের সৌন্দর্য ও ব্যবহারিক সুবিধার কারণে অনেক পরিবারেই দেখা যেত এসব ফিল্টার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার এবং বাজারে নানা ধরনের প্লাস্টিক ও আধুনিক ফিল্টারের সহজলভ্যতায় ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প। চাহিদা কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ে একের পর এক ব্যবসায়ী এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
হবিগঞ্জের মাধবপুরে তৈরি হতো জনপ্রিয় মোজাইক পাথরের পানির ফিল্টার। একসময় এখানকার বিভিন্ন কারখানা ও দোকানে দিনভর চলত ফিল্টার তৈরির কাজ। মাধবপুরের এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের দাবি, আগের মতো অর্ডার ও ক্রেতা না থাকায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে। অনেকেই লোকসান সামলাতে না পেরে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। ফলে শুধু একটি ব্যবসা নয়, হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছে স্থানীয় কারিগরদের দীর্ঘদিনের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের একটি ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্র।
কারিগরদের নিপুণ হাতে সিমেন্ট, মোজাইক পাথর ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি হতো বাহারি নকশার পানির ফিল্টার। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব ফিল্টার সরবরাহ করা হতো দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক প্রযুক্তির ফিল্টারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প।
একসময় মোজাইক পাথরের তৈরি পানির ফিল্টারের বেশ কদর ছিল। টেকসই গঠন, বাহারি নকশা ও দীর্ঘদিন ব্যবহারের সুবিধার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে এর জনপ্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। এসব ফিল্টার তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন অনেক কারিগর ও ব্যবসায়ী। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বাজারে আধুনিক প্রযুক্তির পানির ফিল্টার, প্লাস্টিকের ফিল্টার ও বিভিন্ন ধরনের বিকল্প পণ্যের আধিপত্যে মোজাইক পাথরের ফিল্টারের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, আগে প্রতিদিনই এসব ফিল্টার তৈরির অর্ডার পাওয়া যেত। ক্রেতাদের চাহিদা থাকায় উৎপাদন ও বিক্রিও ভালো হতো। কিন্তু বর্তমানে আগের মতো ক্রেতা পাওয়া যায় না। অথচ ফিল্টার তৈরির কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহনসহ উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। সেই তুলনায় বিক্রয়মূল্য বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিটি ফিল্টার বিক্রি করেই লাভের পরিবর্তে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
একজন ব্যবসায়ী বলেন, “একসময় এই ব্যবসা করে আমাদের সংসার ভালোভাবেই চলত। নিয়মিত অর্ডার পাওয়া যেত। এখন মানুষ আধুনিক ফিল্টারের দিকে ঝুঁকছে। মোজাইক পাথরের ফিল্টারের চাহিদা অনেক কমে গেছে। উৎপাদন খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে ব্যবসা করে লাভ তো দূরের কথা, অনেক সময় পুঁজিও উঠে আসে না। তাই বাধ্য হয়ে এ পেশা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অনেকে।”
আরেক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই কাজের সঙ্গে জড়িত। এই পেশার সঙ্গে আমাদের জীবিকা ও অভিজ্ঞতা জড়িয়ে আছে। কিন্তু বাজারে চাহিদা না থাকায় দোকান ও কারখানার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন প্রজন্মও এ পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। এভাবে চলতে থাকলে একসময় মোজাইক পাথরের পানির ফিল্টার তৈরির কারিগরই খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা, প্রচার-প্রচারণার অভাব এবং নতুন বাজার তৈরি না হওয়াও এ শিল্পের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। অথচ সঠিক উদ্যোগ ও আধুনিক নকশার সমন্বয় ঘটাতে পারলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
স্থানীয় ঐতিহ্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মোজাইক পাথরের পানির ফিল্টার শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় হয়তো স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নেবে একসময়ের জনপ্রিয় এই শিল্প।